আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

অত:পর একটু প্রশান্তির প্রত্যাশায়…


ভিডিও এডিটিং এর জন্য দুই মিনিট অডিও’র প্রয়োজন হলো৷ বাসায় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি৷ একটু নিরবতার অাশায়৷ পাশের বাসার সৌখিন ভাবি মোবাইলে জোড়ে অাওয়াজ দিয়ে গান শুনছেন, অন্য পাশের বাসার ভাইজান একই অাওয়াজে ওয়াজ শুনছেন, অার নিজ বাসার পাশের রোমে স্ত্রী টিভিতে ‘গোয়েন্দা’ দেখছে খুব মনোযোগ দিয়ে৷ ভাবলাম কারো স্বাধীনতা খর্ব করতে পারি না, অাবার কাউকে বাধাও দিতে পারি না; বরং অামিই বাইরে চলে যাই৷ অামি মিনি শহর অনুকরনে উন্নীত গ্রামে থাকি, তাই ঘর ছাড়া নিরব স্থানও পাই সহজে৷ চলে গেলাম বাইরে রাস্তার এক কিনারায়৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতে মোবাইল নিয়ে রেকর্ড শুরু করেছি৷ এক মিনিট যেতে না যেতেই রাস্তা দিয়ে হঠাৎ এক ভদ্র লোক সেই মারফতি গানের ভক্তিমুলক স্বর দিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছেন৷ অামার কাজের বিরতি! তিনি চলে গেলে পুণরায় শুরু করলাম নতুনভাবে৷ অাবার বিপরীত পাশ দিয়ে এক মুরব্বী মোবাইলে লাউড স্পীকার দিয়ে কথা বলতে বলতে দ্রুত চলে গেলেন৷ কিছু অান্দাজ করতে পারি নাই, তাই পূর্বের রেকর্ডও ভেস্তে গেল৷ মন খারাপ করে ফিরে এলাম৷ রেকর্ড অার লাগবে না- জিদই করলাম৷পাশের গ্রামে মাহফিল চলছিল৷ দশটি মাইক লাগানো হয়েছে৷ একটি মাইক অামাদের গ্রামের এক পার্শ্বে টানানো হয়েছে৷ মাহফিলের কার্যক্রম মাগরিব বাদ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল দশটা থেকেই শিশু কিশোরদের গজলে মুখরিত৷ সেদিন মোবাইলে কারো সাথে ফোন করা ও রিসিভ করা বন্ধ রাখলাম৷ ভাবলাম পাশের রাস্তায় ধূলা উড়ে তাই মুখোশ দিয়ে  যাই কিন্তু মাইকের এত শব্দ কিভাবে রুখবো? সিদ্ধান্ত নিলাম রাতে মাহফিলে যাব৷ স্টেইজের পাশে বসতে অসুবিধা হলো না, কারন শ্রোতা তেমন নাই৷ মাইকের অাওয়াজে অতিষ্ট৷ কয়েকজনকে অনুরোধ করলাম অাওয়াজ একটু কমিয়ে দিতে অথবা মাইক ঘুরিয়ে দিতে৷ কিন্তু কেউ কোনো কর্ণপাত করেনি৷ মাওলানা সাহেব মঞ্চে বসে দু’মিনিট না যেতেই বলছেন,” কিরে, মাইকের অাওয়াজ হচ্ছে না কেন? মাহফিলের কর্তৃপক্ষ ভালো মাইক দিতে না পারলে অামাকে দাওয়াত দেন কেন?” কিছু বলার অধিকার নাই, তাই ফিরে এলাম অতি কষ্টে ঘন্টা খানেক থেকেই৷ প্রশ্ন হচ্ছে, এক বাড়িতে মাহফিল, গানের অনুষ্ঠান কিংবা অন্য অনুষ্ঠান হলে সারা গ্রামে/মহল্লায় মাইক বাজবে কেন? ইসলাম কি মানুষবে কষ্ট দিয়ে ওয়াজ শুনানো সমর্থন করে? একটি এলাকায় অসুস্থ রোগি, বৃদ্ধ, পরীক্ষার্থীসহ নানান ধরনের লোক থাকে৷ সবাইকে বাধ্যতামুলকভাবে জোড় করে অনুষ্ঠান শোনাতে হবে কেন? যার ইচ্ছা হয় সে স্টেইজে গিয়ে মাহফিল শোনবে৷ সারা এলাকায় মাইক টানিয়ে ঘরে বসে শোনার ব্যস্থা করে দিলে প্যান্ডেল বানানোর দরকার কী?অামি যে স্কুলে শিক্ষকতা করি সেটি ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক ঘেষে অবস্থিত৷ গাড়ির হর্ণ শোনলে মনে হয় ড্রাইভার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে জানান দিচ্ছেন যে তার গাড়ি এখন দ্রুত চলছে৷ অন্য জায়গায় হর্ণ না দিলেও স্কুলটির পাশ দিয়ে যেতে দুই-চারটি হর্ণ দিতে কখনো ভুলে না যদিও রাস্তায় সাইন বোর্ড লেখা অাছে,” সামনে স্কুল৷” কখনো কয়েকটি গাড়ি একত্রে এমন হর্ণ বাজায় যে শিক্ষার্থীরা কানে হাত দিয়ে বসে থাকতে হয়৷ শহরের অনেক বাসা বাড়ির কথা অকল্পনীয়, যেন সেগুলো শব্দ সন্ত্রাসের মাঝেই তাদের বসবাস৷গাড়িতে উঠলেই একের পর এক হকার! বই, ঔষধ, চেইন, মলমসহ অন্যান্য পণ্যের চাপাবাজির বয়ান দিকে থাকিয়ে.থাকতে হয় অবিরাম৷ কেউ পছন্দ করুক অার নাই করুক; তিনি চালান চাপার জোড়ে তার ছান্দসিত গান৷ কারো স্বাধ বা সামর্থ নাই এ থেকে একটু পরিত্রান পাবার জন্য তাকে কিছু বলতে৷ নিরবে সইতে হয়৷রাস্তায় উঠলেই ডাক্তার, ক্লিনিক, মাহফিল, মৃত্যুর সংবাদ, ১০০ টাকা দামের এনার্জি সেভিং বাল্বের মাইকিং এর অাওয়াজে রাস্তাসহ কাপতে থাকে! নির্বাচনের সময় হলে তো কোনো কথাই নেই৷এ থেকে পরিত্রানের উপায় কী? নিজ গৃহেও শব্দ দূষণের ক্লু থেকে রক্ষা নেই৷ রূপলালের মত কি একটু স্বস্তির অাশায় জঙ্গলে বসবাস করতে হবে নাকি পীর দরবেশের মত পাহাড়ের চূড়ায় অাস্তানা গড়তে হবে? তেমন স্থানও তো পাওয়া যাবে না৷ তাহলে করবো কী? নিজ স্বাধীনতা মানে কি অন্যকে ঘুমাতে না দিয়ে নিজে অানন্দ ফূর্তি করা?বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদফতরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২% মানুষ শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদফতরের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে আসে। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ , ফুসফুসজনিত জটিলতা , মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা।শব্দ দূষণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম৷ শব্দ দূষণে বধিরের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে৷ পরিবেশবিদরা শব্দ এ দেশের শব্দ দূষণকে শব্দ সন্ত্রাস হিসেবে অাখ্যায়িত করেছেন৷ শব্দ দূষণে যে অাইন অাছে তার কোনো একটি এ যাবত কাল প্রয়োগ হয়েছে কিনা উদাহরণে মিলবে না৷ পরিবেশ রক্ষায় অন্যান্য সমস্যা নিয়ে দু’একটি কথা হলেও শব্দ দূষণ নিয়ে কারো তেমন মাথা ব্যথা নেই৷ অামরা চাই একটু স্বস্তি! অপেক্ষায় অাছি একটু নিরবতার প্রত্যাশায়৷
মোহাম্মদ মহসিন মিয়াসহকারি শিক্ষক, ইংরেজিবড় গোবিন্দপুর এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়চান্দিনা, কুমিল্লা৷

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ