আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

অবসর ও কল্যাণে কর্তন নিয়ে কিছু কথা

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী 

বেশ ক’মাস থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন বৃদ্ধি নিয়ে এক ধরনের নাটক শুরু হয়েছে। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই এটি শুরু হয়। শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব সরকারকে বিব্রত করার জন্য কেউ এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কি না কে জানে! 

ছোটবেলা ঘুম পাড়ানোর জন্য মা-চাচিরা ঘুম পাড়ানি গান শুনাতেন। কখনও কখনও জুজুবুড়ির ভয়ও দেখাতেন। তেমনি বেসরকারি স্কুল-কলেজ একত্রে সরকারিকরণের ইস্যুকে বাইপাস করার জন্য ১০ শতাংশ কর্তন নিয়ে জুজুবুড়ির ভয় দেখানো শুরু হয়েছে। ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা যতটুকু উচ্ছ্বাসিত হয়েছিলেন,  ১০ শতাংশ কর্তনের সংবাদে তারচে’ বেশি পীড়িত হয়েছেন। 

একবার কর্তনের প্রজ্ঞাপন দিয়ে আবার সেটি স্থগিত করার কারণে সবাই একটু স্বস্তি বোধ করেছিলেন বটে। কিন্তু গত জানুয়ারির বেতন থেকে ১০ শতাংশ কর্তনের সংবাদটি চাউর হবার পর চারদিক থেকে প্রতিবাদ ওঠতে থাকে। কেবল কারিগরি শিক্ষকদের জানুয়ারির বেতন থেকে কর্তন বহাল রেখে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের অতিরিক্ত কর্তন স্থগিত রাখা হয়। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা আপাতত আশ্বস্থ হলেও নিশ্চিত হতে পারছেন না। তাদের আশঙ্কা শিক্ষক বিদ্বেষীরা মনে হয় ১০ শতাংশ কর্তন করেই ছাড়বে। প্রজ্ঞাপনটি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত এমন আশঙ্কা থেকেই যায়। কারিগরি শিক্ষকদের কর্তন বহাল রেখে সে রকমই একটি বার্তা দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
 
কারিগরি শিক্ষক-কর্মচারীরা বিষয়টি কীভাবে নীরবে মেনে নিয়েছেন সেটি বুঝে উঠতে পারিনি। তারা এর তেমন প্রতিবাদ করেছেন বলে চোখে পড়েনি। যারা টানা দ্বিতীয় মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিল তারাই তৃতীয় মেয়াদের নতুন সরকারকে দুর্নামের দিকে ঠেলে দেবার পাঁয়তারায় আবার মেতে উঠেছে।

নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে যখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খ্যাত শেখ হাসিনা পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ভালোবাসা, সমর্থন অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ঠিক তখন কারা শিক্ষক-কর্মচারীদের উত্তেজিত করার জন্য তাদের স্বার্থ পরিপন্থি প্রজ্ঞাপন জারি করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল? নতুন সরকার যখন নতুন উদ্যমে দেশকে এগিয়ে নেবার প্রত্যয় ঘোষণা করে ঠিক সে মুহূর্তে কারা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো? শেখ হাসিনার সরকার চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন সরকারিকরণের স্বপ্নে বিভোর তখন এ ধরনের প্রজ্ঞাপন তাদের স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেবার অপপ্রয়াস ছাড়া অন্য কিছু নয়। এর নিন্দা জানাবার ভাষা অনেকেই খুঁজে পান না।
 
শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব সরকারকে শিক্ষক সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার এ কূট-কৌশল পরিহার করতে হবে। তা না হলে সরকারের যেমন দুর্নাম হবে তেমনি দেশ ও জাতির অকল্যাণ হবে। শিক্ষা ও শিক্ষকদের পেছনে যেকোনো ব্যয় কোনোভাবেই অপচয় নয়। সেটি বরং সবচে’ বড় বিনিয়োগ। সেটি আমলারা না বুঝলেও সরকারকে অনুধাবন করতে হবে। আমলারা জনসাধারণের নিকট জবাবদিহি করেন না। সরকারকে সেটি করতে হয়। 

একটা বিষয় আমার মাথায় আসে না। শিক্ষকদের দু’ আনা দু’ পয়সা দিতে এতো কষ্ট লাগে কেন? তাদের থেকে কেটে নিতেই বা এত উৎসাহ কেন? জাতি গঠনের কারিগর আখ্যা দিয়ে শিক্ষকদের সাথে এসব আচরণ মোটেই শোভনীয় নয়। যে কেউ বলতে পারেন, বর্ধিত কর্তন শিক্ষক-কর্মচারীর কল্যাণের জন্য। কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যাবার পর অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা পেতে যে কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাতে হয় সেটি ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা বুঝে ওঠা কঠিন। অধিকন্তু, এ টাকা হাতে পাবার আগেই অবসরপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক-কর্মচারী পরপারে পাড়ি জমান। কেননা, পাঁচ-সাত বছরের আগে টাকা হাতে আসে না। অনেকে হিসেব করে দেখেছেন সমপরিমাণ টাকা নিজের আলাদা একটা একাউন্টে মাসে মাসে জমা করে রাখলে এককালীন যে টাকা পাওয়া যাবে তা অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকার সমান না হলেও খুব একটা কম হবে না। এ টাকা পেতে কোনো কষ্ট কিংবা দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। ইচ্ছে করলে যেকোনো সময় ওঠানো যাবে। এ দিক বিবেচনায় অবসর ও কল্যাণ তহবিলের কর্তন শিক্ষক-কর্মচারীদের তেমন একটা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।                            

বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন থেকে যে টাকা কর্তন করা হয় তা কোন হিসেবে গিয়ে জমা হয় কে জানে! আবার অবসর নেবার পাঁচ-সাত বছর কিংবা আরো পরে যে টাকা পাওয়া যায় তাতে শিক্ষকের জমা কত আর সরকারের অনুদান কত সে বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। এরূপ অস্পষ্টতার কারণে কর্তন বিষয়ে অনেকের আপত্তি। তারপরও সবাই অবসরে চার শতাংশ আর কল্যাণে দুই শতাংশ মিলে মোট ছয় শতাংশ কর্তন এতদিন ধরে মেনে আসছেন। কিন্তু সে জায়গায় এখন দশ শতাংশ কর্তনের বিষয়টি কেউ মেনে নিতে পারছেন না। এ সিদ্ধান্তকে কেউ ‘কাঁটা গায়ে লবনের ছিটা’ আবার কেউ ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ বলে মনে করছেন। এখন তাই সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে নানা ক্ষোভ আর কষ্ট। সে ক্ষোভ দিনে দিনে চরমের দিকেই যাচ্ছে।

স্কুল-কলেজ এক সাথে সরকারিকরণের বিষয়টি আজ নতুন কোনো ইস্যু নয়। পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট আর বৈশাখি ভাতার দাবি পূরণ হবার পর সরকারিকরণের ইস্যুটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ সময় অবসর ও কল্যাণ তহবিলে কর্তন বৃদ্ধির গেজেট একেবারে বেমানান। তাই এটি অবিলম্বে বাতিল করা খুবই সমীচিন হবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের পেশাগত নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাদের চাকরি সরকারিকরণ করে কর্তনের ভেজাল বন্ধ করা সময়ের আরেক বড় দাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ বিষয়ে ভেবে দেখার সবিনয় অনুরোধ জানাই। ‘শীঘ্রং শুভং’- যত শীঘ্র তত মঙ্গল।

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ