আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :
«» জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার উপায় «» সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মোস্তফা কামালের ‘থ্রি নভেলস’ «» ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের প্রতিবাদে পটুয়াখালীর বাউফলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সামবেশ «» দুমকিতে ডাব খাওয়ার অপরাধে দু’ছাত্রকে মারধর,শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টা «» কলাপাড়ায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রচার ও উন্নয়ন ভাবনা শীর্ষক মতবিনিময় সভা «» স্বরুপকাঠীতে শিক্ষক সমিতির ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত «» নদী বিষয়ক বইমেলা উদ্বোধন «» নরসিংদীতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্ট এর উদ্বোধন «» ঢাকায় সাপের দংশনে প্রাণ গেল কলেজছাত্রের «» লন্ডনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

“আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক আলোচনা”

 

একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বয়স মাত্র ৪৭ বছর হতে চললো। তবে একটি রাষ্ট্র কতটুকু উন্নত হবে অথবা তার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি কোনদিকে এগোচ্ছে তা বোঝা যায় তার শিক্ষানীতি ও শিক্ষা কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনেকটাই সংকটাপন্ন বা মেঘাচ্ছন্ন। স্বাধীনতার বয়স অনুপাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি বা পরিপক্কতা আশানুরূপ অর্জিত হয়নি মোটেই। আর যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে দৃষ্টি দেয়া হয়নি কখনোই। তাই বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে, কিছু সংখ্যক শিক্ষা-ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউই সন্তুষ্ট নয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার নানাভাবেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক প্রয়াস চালাচ্ছেন। কিন্তু এও সত্য যে, শিক্ষায় জড়িত কর্তাব্যক্তিদের অযোগ্যতা অদক্ষতা ও উদাসীনতায় শিক্ষার উন্নয়নে কাংখিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে দেশের বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানী-গুণী ও শিক্ষাবিদের একমাত্র দায়িত্ব হওয়া উচিত মানসম্মত শিক্ষায় মনোনিবেশ করা।

আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায় নীতিবান, আদর্শবান, চরিত্রবান হবে কিংবা দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁর অর্জিত শিক্ষার ওপর। শিক্ষার মান উন্নয়নে কি করা উচিত, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সমাজ এবং শিক্ষকের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষার মানোন্নয়নে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তা উত্তরণে কিইবা করণীয়, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। শিক্ষায় চালকের আসনে শিক্ষক আর শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া। শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বপ্রথম নজর দিতে হবে শিক্ষকদের মর্যাদা ও জীবনমানের উপর। আমাদের মনে রাখতে হবে একজন ভালোমানের মেধাবী অভিজ্ঞ দক্ষ শিক্ষকই আগামী প্রজন্মকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ই জানুয়ারি’৭২ স্বদেশ
প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই বুঝতে পারেন এই জাতিকে সুশিক্ষিত করা না গেলে কখনোই সোনার বাংলা বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি ১৯৭২ সালেই ডঃ কুদরতই খুদার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। তিনি একত্রে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বেতন-ভাতা নির্ধারণ ও রেশনিং এর ব‍্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৫ই আগস্ট’৭৫ মহান নেতা জাতির জনককে নৃশংস হত্যাকান্ডের পর দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে বারবার শিক্ষানীতির পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের স্বীকৃত স্থিতিশীল জাতীয় শিক্ষানীতি বিহীন, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন অসম্ভব। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো নিজেদের অবদান প্রতিষ্ঠিত করার মানসে বারবার শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষা কমিটি গঠন করেছে। এতে করে পাবলিক পরীক্ষাসমূহ, পাঠ্যবই, পাঠ্যসূচি থেকে শুরু করে পরীক্ষা পদ্ধতি, ফলাফল ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়াদির ব্যাপক পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রতি বছর নতুন নতুন বিষয় সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়েছে পাঠ‍্যক্রম পাঠ‍্যসুচীতে। এছাড়াও জাতীয় ভাবে স্বীকৃত স্থিতিশীল কোন শিক্ষানীতি তৈরি করা সম্ভব না হওয়ায় শিক্ষায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রনয়ন ও অনুমোদিত হয় ১৯শে ডিসেম্বর’১০। এই জাতীয় শিক্ষানীতি একটি স্থিতিশীল শিক্ষা কার্যক্রমের শুভ সূচনার সৃষ্টি করেছে সত্যি। এই শিক্ষানীতি অনুসারেই এখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১২ সালে এনসিটিবি জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে পাঠ্যবই ও পাঠ‍্যসুচী প্রনয়ন করে। সরকারের সদিচ্ছায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি শিক্ষার্থীও বিনামূল্যে পড়ার বইটি বছরের শুরুতে হাতে পেয়ে যাচ্ছে। অতীব দুঃখের বিষয় গত ৮ বছরেও জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৭% শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা, অপরদিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাত্র ৩% শিক্ষার দায়িত্ব বহন করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি খাতে দিতে পারলেই সরকার শিক্ষার দায় থেকে মুক্তি পায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও কতিপয় নীতিনির্ধারকদের চরম বিরোধিতায় শিক্ষক ও শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সরকারের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সামাজিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতেই জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। আর শিক্ষানীতির চাহিদা হলো শিক্ষার্থীর দক্ষতা, নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং সামাজিকতা অর্জন।

মানোন্নত শিক্ষায় প্রয়োজন গুণগত শিক্ষক। শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় না করতে পারলে, মেধাবীরা পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিতে চাইবেনা এটাই স্বাভাবিক। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, শিক্ষকতা পেশাকে আমাদের দেশে খাটো চোখে দেখা হয়।
একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার বক্তব্য এমনি ” দেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। দেশ যদি স্বাধীন না হতো, তবে আমারা হয়তোবা পিয়ন বা শিক্ষক হতে পারতাম” উল্লেখিত বক্তব্য হতে প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষক ও পিওন এক জাতীয় পেশাজীবী। কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি অন্য যে কোন পেশার থেকে অনেক অনেক কম। বলতে দ্বিধা নেই, একজন পিয়নের চেয়ে একজন শিক্ষকের বেতন ভাতা কম। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে অবশ্যই শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও সম্মানজনক মর্যাদা দিতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা যথেষ্ট নয় বিধায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে না। শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বপ্রথমেই শিক্ষকদেরকে সচ্ছল জীবন মানের উপর নজর দিতে হবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি পরিহার করতে হবে। ৯৭% শিক্ষাকে বেসরকারি রেখে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অসচ্ছল অভিভাবকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব‍্যয় নির্বাহে অসমর্থ। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় দরিদ্র সন্তানের শিক্ষার ব‍্যয় নির্ধারণে সরকার বরাবরই নিশ্চুপ ছিল। ফলে একশ্রেণীর ব‍্যবসায়ি শিক্ষা নিয়ে লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। শিক্ষা ব‍্যয় সামর্থ্যের অধিক হওয়ায় প্রতি বছরই ঝরে পড়ছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। আতংকের বিষয় এই যে, ঝরেপড়া শিক্ষার্থীরাই সমাজে নানাবিধ অন‍্যয়, অপকর্ম, নেশাগ্রস্ত, ইভটিজিং ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী ও সুশীল সমাজসহ শিক্ষার সমস্যাসমূহ চিন্হিত করে তার উত্তরণে যা যা করণীয় তা জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। দ্বিমুখী শিক্ষানীতি বাতিল করে, সকল স্তরের শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। দেশের মানুষের শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, এর দায় সরকার কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। সাধারণ মানুষের টেক্স ভ‍্যাটের টাকায়, নির্দিষ্ট কোন শ্রেণী পেশার বা গোষ্ঠীর সন্তুষ্টিতে ব‍্যয় করা মানবিকতা বিবর্জিত ও গর্হিত কাজ। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রের মতো শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও বরাদ্দ দিতে হবে। যথাশীঘ্র সম্ভব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মাধ্যমে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে, জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব‍্যয় হবে না। এতে শিক্ষাব্যবস্থার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে আসবে। শিক্ষায় সকল অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ হবে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে। আর এই যৌক্তিক দাবি আদায়ে সকল শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সোচ্চার হতে হবে এখনই।
আজ এই হোক আমাদের দীক্ষা, চাই মানসম্মত শিক্ষা।

” প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের একমাত্র সমাধান শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ”

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম
ঢাকা বাংলাদেশ।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ