আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

উপন্যাসঃ”উদভ্রান্ত প্রেম”পর্বঃ৪৮ – শিক্ষার কণ্ঠস্বর

উপন্যাসঃ”উদভ্রান্ত প্রেম”পর্বঃ৪৮
লেখক,কমলকান্ত রায় তালুকদার

প্রথম প্রথম মিতু পড়া বুঝতে তার কমলদার সাথে কেবল প্রয়োজনীয় কথা বলতো।কিন্তু আজকাল মিতুর কথার পরিধি অনেকটা বেড়ে গেছে।
কমলও ভাবছে,মিতু মনে মনে কি ভাবতে শুরু করেছে।মিতু কি ভাবছে, কারনে অকারনে তার কমলদা তার দিকে একটু বেশী বেশী চেয়ে থাকে কেন?তাহলে কি কমলের চেয়ে থাকা,হেসে কথা বলা,সবই কি মিতুর নিকট অস্বাভাবিক লাগছে।কমল ভাবছে,সে তো উদভ্রান্ত;তার পক্ষে পল্লবীকে চাওয়া,পল্লবীর প্রতি প্রেম-উদভ্রান্ত প্রেম কিন্তু সে তো উন্মাদ নয়।তাকে কেন মিতু অস্বাভাবিক ভাববে?আসলে মিতুর চেহারার অবয়বে যে কমলের প্রিয়া পল্লবীর ছবি ভেসে ওঠে,তা কমল ছাড়া অন্য কেহ জানে না।কমল মাঝেমধ্যে চোখ ফিরিয়ে নিলেও তা যেন মিতুর চোখকে ফাঁকি দিতে পারছে না।মিতু কমলকে দাদা ডাকলেও আসলে সে তো তার উস্তাদ।আর ধর্মের দিক দিয়েও ভিন্ন।যদিও পল্লবীর চেহারার সংঙ্গে,গায়ের বর্ণ আর ধর্মের বর্ন তো এক কথা নয়।
ইতিমধ্যে মিতুর ১ম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়েছে।মিতুর রোল নম্বর ছিল ৩৮ নম্বর।১ম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে।মিতু তার ক্লাসের ১৯২ জন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ৩৮ নম্বর থেকে ৩য় স্থানে উন্নীত হয়েছে।মিতুর এ মেধাবিকাশে তার কমলদার সুনাম বেড়ে গেছে।এ ক’মাসে মিতু তার কমলদার সহায়তায় লেখাপড়ার অনেক উন্নতি করেছে।মিতু পড়ালেখার বিকাশে বাড়ির সকলেই আনন্দিত।কিন্তু সেদিন মিতুর মায়ের নিকট কমল জানতে পারে মিতুর জ্ঞানের তৃষ্ণা নাকি আরো বেড়ে গেছে।মিতু আরও ভাল রেজাল্ট করতে চায়।সামনের বার্ষিক পরীক্ষায় সে ১ম স্থানে উর্ত্তীন হওয়ার কথা ভাবছে।মিতুর মা একদিন কমলকে ডেকে বলল,”মাষ্টার বেটা, তুমি মিতুকে প্রতিদিন বিকালে ঘন্টা-দেড়েক পড়াও কিন্তু এতে মিতুর লেখাপড়ার অনেক উন্নতি হয়েছে।কিন্তু মিতু ও আমরা সকলে তোমাকে অনুরোধ করছি,তুমি রাতের বেলায় মিতুকে আরও ঘন্টা-দেড় সময় দিলে আমরা খুবই খুশী হতাম”।সেদিন কমল তার দাদামনির সামনেই মিতুর মায়ের প্রশ্নের উওরে না’সূচক উত্তর দিয়েছিল।কমল তার ডিগ্রি ১ম বর্ষের পরীক্ষায় পড়ার ক্ষতির দিকটির কথা বলেছিল।কমলের দাদামনি অবশ্য এ ব্যাপারে কমলের ইচ্ছার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।কমল অবশ্য বুঝতে পেরেছিল দিনের আলোতে মিতু ও রাতের আঁধারে মিতুর ভিন্নতা স্বাভাবিক।এ ভিন্নতা কমলের জীবনে নতুন আরেক পল্লবী জন্ম হোক,সে তা চায়নি।না কমলকে ডিগ্রি পাশ করে একটি চাকুরী খুঁজতে হবে।অসুস্থ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে কমলকে জীবনে প্রতিষ্টিত হতে হবে।ছোটবোনটিকে বিয়ে দিতে হবে।তার অনেক দায়িত্ব।কমলের জীবনে যাই থাকুক,প্রেম নেই।নারী প্রেমের অমৃত সুধা পান কমলের ছন্নছাড়া জীবনে নেই।কমলের উদভ্রান্ত প্রেমের জীবনানুভূতি সারাক্ষণ অশ্রুসজল।কমল তার কলেজের নাটকের অভিনয়ে বিয়োগাত্মক নাটকের চরিত্রে নায়কের ভূমিকায় যেমন নায়িকা তাকে ভুলে গিয়েছিল,তেমনি বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটবে।
কয়েক মাস পরে কমলের দাদামনি দীর্ঘ ৬৫ হাত পাকা বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করে।এ সময়টা বাড়ির পূর্ব পার্শ্বে টিনের ছালা ঘরে সাময়িক থাকার ঘর তৈরি করা হয়।অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি।এ সময়টা কমলের ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা। এ সময়টা কমলের পড়ালেখার ছাপ।তাই এবার দাদামনি থেকেই প্রস্তাব আসে,ঘর বাঁধার এ সময়টা কমল মিতুদের বাড়িতে রাতের পড়ালেখা ও ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হবে।পরদিন সন্ধায় মিতুদের বাড়ি থেকে দাদামনি খবর পাঠিয়েছে।মিতুর মায়ের রোমে দাদামনি বসে আছেন।মিতুর মুখের হাসিটা অন্য যে কোন দিনের তুলনায় উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে।সবাই যেন কোন সুখবর দিতে কমলকে ডেকেছে।মিতুর হাসিটায় পল্লবীর হাসিটাকে মনে করে দিচ্ছে।প্রথম যেদিন পল্লবী কমলকে মঙ্গলচন্ডী মন্দিরের পেছনের বেদীতে নিজেকে সারপ্রাইজ করেছিল ঠিক সেদিন পল্লবী যেমন হাসিটি দিয়েছিল।ঠিক হলো কমল প্রতিদিন তার দাদামনির বাড়িতে রাতের খাবার শেষ করে মিতুদের বাড়িতে পড়তে ও ঘুমাতে আসবে।মিতুর টেবিলে একই সংঙ্গে দু’জনই পড়বে।পরদিন দাদামনির ঘর ভাঙ্গা হয়েছে।ইতিপূর্বেই ইট,বালু,সিমেন্ট এসে গেছে।কমলের বই পত্রাদি মিতুদের কাজের লোক নিয়ে গেছে।কমলের ব্যাগ,কাপড়-ছোপড় দাদামনির নতুন ছালাঘরে রাখা হয়েছে।বাড়ির সবার মনে নতুন বাড়ির তৈরির আনন্দে অনেকটা মাতুয়ারা।দাদামনিদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্যে একটি আলাদা ঘর তৈরি করা হয়েছে।ভাঙ্গা বাড়ির নতুন চিত্র দেখতে অন্য রকম লাগছে।কমল আজ কলেজ থেকে ফিরে গোয়ালা বাজারের প্রাইভেট শেষ করে।দুপুরের খাবার শেষ করে লাক ফার্ণিচার দোকানে গিয়ে দেখে,দোকান বন্ধ।সুষমা লন্ডির চক্রবর্তী দাদা জানিয়েছেন,আজ দাদামনির বাড়ি পুরাতন ঘর ভাঙ্গা হচ্ছে তাই আজ দোকান,কারখানা সবই বন্ধ।ঘর ভাঙ্গা হচ্ছে কমল জানতো কিন্তু দাদামনি যে আজ দোকানেই আসবে না,তা সে জানতো না।অগত্যা কমল একটা রিস্কা খুঁজছে। লজিং বাড়ি চলে আসতে হাজী নসিবউল্লাহ মার্কেটের সামনে।হঠাৎ চোখে পড়ে মিতুর বড় ভাই সুরুজ ভাইকে।তারপর দু’জনে একই রিস্কায় বাড়ি ফিরছে।সুরুজ ভাই তাদের বাড়ির সামনে রিস্কা থেকে নামার সময় কমলকে এক ধরনের জোর করে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়।কমল বিকেলের এ সময়টা প্রায়ই দাদামনির বাড়ি দক্ষিন সংলগ্ন রাধামাধব মন্দিরে কাটায়।তাই সে চলে যেতে চেয়েছিল।কমল সুরুজ ভাইয়ের রোমে গিয়ে দেখে মিতু কমলের বই সাজাচ্ছে।বিছানা পরিপাটি করছে।আজ থেকে এ রোমেই কমল থাকবে,পড়বে ও একই টেবিলে মিতুও পড়বে।কমল তার পড়ালেখার পাশাপাশি মিতুকেও পড়ালেখায় সহযোগীতা করবে।
কমলের প্রবাস পাতার আজ এক বছর পূর্ন হলো।কমলের প্রবাস পাতায় দাদামনির সহযোগীতায় কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে,বই কেনা,প্রাইভেট পড়িয়ে রোজগার সবই দাদামনির চেষ্টায় সম্ভব হয়েছে।আগামী বছর সিলেট এম,সি,কলেজ কেন্দ্রে কমলকে ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে হবে।কমল প্রথম তাজপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৯১-৯২ইং শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পরীক্ষার রেজিষ্টেশন করেছিল।পরে সিদ্বান্ত হলো ১৯৯৩ এ চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয় তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথমবার ডিগ্রি পরীক্ষার আসনে বসতে হবে।সেজন্যে কমল পরীক্ষায় সফল হবার জন্যে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানুষের জীবনে প্রতিষ্টাতা লাভের জন্য প্রেরণার দরকার হয়।বন্ধুত্বের প্রয়োজন হয়।একমাত্র ভাইবন্ধু সাধন মাঝেমধ্যে দু’একটি পত্রের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিয়েছে।সাধন বলেছে,সে যথারীতি পল্লবীকে কমলের ঠিকানা দিয়েছে,কিন্তু আজ এক বছর পূর্ন হলো অথচ পল্লবী একটিও পত্র দিল না।কমলের আজও মনে পড়ে,সেই মাসির বাড়ির জানালার কার্নিশ,দেবদারু গাছটির ডালে,টিউবওয়ের পাশে মঙ্গলচন্ডী মন্দিরের বেদীর পেছনটায় পল্লবী পত্র রাখার এক-একটা স্থান।শুক্রবারের চিঠিটা পাওয়া যেত মঙ্গলচন্ডী মন্দিরের পেছনের মেহেদি দেয়ালের বেদীমুল এর উপরের বেড়ার টাঙ্গানু মনসাপূজার পুরাতন নৌকার চৌরঙ্গীতে।সাধনের চিঠিতে কমল আজ জানতে পারে পল্লবী বর্তমান অবস্থা।পল্লবী মাঘান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস,এস,সি পাশ করার পর ময়মনসিংহ মোমেনুনেছা মহিলা কলেজ থেকে এইচ,এস,সি পড়ছে।অলকা সিনেমা হলের পেছনে তার মামার বাসা থেকে তার কলেজের পড়ালেখা চলছে।গত গ্রীস্মের ছুটিতে বাড়িতে এলে তার শরীরে ভীষন অসুখ দেখা দেয়।তার সমস্ত শরীর নাকি ফুলে গিয়েছিল।মুখ এমনভাবে ফুলে গিয়েছিল যে,পল্লবীর চোখ জোড়া দিয়ে কোন রকম দেখতে পেত।তখন ময়মনসিংহ মেডিকেলের নিউরো মেডিসিনের ডাক্তার সৌমিত্র সরকার তার অধিক দুঃচিন্তাকে দায়ী করেছিলেন।সাধনের চিঠিতে পল্লবীর অসুস্থতার খবর জেনে কমল খুবই মর্মাহত হয়েছে।হয়তো কমল ও তার ভালবাসা নিয়ে চিন্তা করতো পল্লবী!যার জন্যে এত বড় অসুখ বাঁধিয়েছে।কয়েকদিন কমলের কোন কিছুতেই ভাল লাগেনি।একা থাকলেই কমলের মনটা আরো ভেঙ্গে পড়ে।তাহলে কি তার তিলতিল করে গড়া প্রেম,ভালবাসা কি হারিয়ে যাবে চিরতরে!

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ