আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

উপন্যাসঃ”উদভ্রান্ত প্রেম”পর্বঃ৫০ লেখক,কমলকান্ত রায় তালুকদার-শিক্ষার কণ্ঠস্বর

উপন্যাসঃ”উদভ্রান্ত প্রেম”পর্বঃ৫০
লেখক,কমলকান্ত রায় তালুকদার

মিতুদের বাড়িতে রাতের পড়া শেষে ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ মাঝরাতে কমলের ঘুম ভাঙ্গে।অগ্রহায়ণ মাসের শেষ সপ্তাহ।কমলের বেশ শীত লাগছে।বিছানায় একটি নকশী কাঁথা গায়ে দিতে গিয়ে মিতুর মিনি বিড়ালটি লাফিয়ে ওঠে।মনে হয় মিতুর মিনি বিড়ালটি বিছানায় নকশী কাঁথাটির আশপাশে ঘুমিয়ে ছিল।বিছানার চাদরে,নকশী কাঁথায়,বালিশের কভারে সর্বত্রই পারফিউম এর গন্ধ।মিতু এমন ভাবে বিছানাটি সাজিয়েছে যেন,বাসর রাতের মতো সাজানু-ঘুচানো,পারফিউম এর সুগন্ধিতে মধুময়।কিন্তু কেন?এতটা সাজানু-গোছানুর কোন প্রয়োজন তো কমল মনে করছে না।অথচ তার লজিং বাড়ির চাঁদরটা তো দু’তিন সপ্তাহ পর ধৌত করা হয়।
বাথরুমে যাবার জন্যে কমল চার্জ লাইট জ্বালায়।বাথরুম সেরে আসার পথে তার চোখে পরে মিতু ঘুমাচ্ছে।মিতু বাম হাতটিতে একটা নিত্য দিনের লেখার ডায়েরির পাতা।মিতুকে কমল প্রতিদিনের ডায়েরি লেখার কথা বলেছিল।তাহলে কমলের কথায় মিতু কি সত্যিই সাহিত্য চর্চা করে?এটি তো নিঃসন্দেহে একটি ভাল অভ্যাস।এতে তার সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ হবে।কমলের জানতে ইচ্ছে করছে মিতু সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে বর্তমানে কোন বিষয়টি বেছে নিয়েছে।সে কি তার লন্ডনের প্রিয়তম খালাতো ভাইকে নিয়ে লিখছে,নাকি বর্তমানের জীবনের অন্য কোন বিষয়কে নিয়ে লিখছে।কারন মিতুর তো পরবর্তী জীবনের সবকিছুই ঠিক হয়ে আছে।পারিবারিক ভাবেই তার সংঙ্গে তার খালাতো ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।কমল প্রথমদিন এসে দাদামনির গোয়ালাবাজার “লাক ফার্ণিচার”দোকানে বসেই তার দাদামনির কাছে মিতুর পরবর্তী জীবনের গল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছিল।মাঝেমধ্যে মিতুর মা কমলকে তার লন্ডনের বোনের ছেলের গল্প করেছে।তার মেয়েটি যদি এস,এস,সি পাশ করে তবে বিয়ের আংটি পরানুর কাজটা সেরে ফেলতে চায় তারা।আবার মিতুর মা মাঝেমধ্যে তার একমাত্র মেয়েকে সুদূর লন্ডনে বিয়ে দিতে হবে,এ জন্যে মিতুর মা কান্নাকাটিও করতো।তারপর লন্ডন গিয়ে যদি তার স্বামী পড়ালেখা করায়,তবে হয়তো মিতুর পড়ালেখা চলবে।না হয় বাংলাদেশের পড়ালেখাই তার জীবনের শেষ পড়ালেখা।
কমল রোমে এসে মোটেই স্বস্তি পাচ্ছে না।বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও মোটেই তার ঘুম আসছে না।আবার কমল চার্জ লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে যাবার ছল ধরে মিতুর বিছানার পাশে দাঁড়ায়।তার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জাগে কি যেন লেখা রয়েছে ডায়েরির পাতায়।কমলের ইচ্ছে হচ্ছে ডায়েরির পাতার টুকরাটি আলতুভাবে নিজ হাতে নিয়ে আসবে।কিন্তু মিতুর মিনি বিড়ালটি কমলের বিছানা থেকে মিতুর বিছানায় মুক্তিযোদ্ধার মতো হামাগুড়ি দিয়ে সন্তর্পণে মিতুর কাঁথার ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে।মিনি বিড়ালটির সামান্য নড়াচড়াতেই মিতু তার হাতের ডায়েরির পাতাটি ছেড়ে দিয়ে,পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে।কমল ডায়েরির পাতাটি হাতে নিয়ে আবার তার রোমে চলে আসে।
এক অজানা সন্দেহে কমলের মনটা ভারী হয়ে ওঠে।কমল এবার চার্জ লাইটা নিয়ে বিছানার মশারির ভেতরে প্রবেশ করে।ডায়েরির পাতাটি দেখে মনে হচ্ছে,আজকের রাতে ঘুমানোর পূর্বেই লেখা হয়েছে।এইতো আজকের তারিখ লেখা রয়েছে।কমল তার কৌতূহল মেটাতে এবার ডায়েরির পাতার লেখা শুরু করে অনেকটা অবাক হয়ে যায়।কারন লেখাটি যে কমলকে নিয়েই লেখা।
ডায়েরির পাতাটিতে লেখা,শিরোনাম”প্রথম রাতের কমলদা,”২২শে অগ্রহায়ণ ১৪০০ সালঃআমার কমলদা,একজন কন্ঠশিল্পী,লেখক,কবি ও আদর্শ শিক্ষক।তিনি আমায় খুবই স্নেহ করেন,আদর করেন এবং মাঝেমাঝে শাসনও করেন।কিন্তু আমার মনে একটা প্রশ্ন বার বার জাগে তার মনে কি কেউ ব্যাথা দিয়েছে?যার জন্যে কমলদা নিজের বাড়ি ছেড়ে দুর প্রবাসে পড়তে এসেছেন।নাকি কেবল দারিদ্র্যের কারনেই কমলদাকে সব সময় আনমনা মনে হয়।কমলদার মনমরা অবস্তার পেছনে কি কারন থাকতে পারে,আমার জানতে ইচ্ছে করে।আমার আজ মনে পড়ছে যেদিন দাদামনির লাক ফার্ণিচার দোকানে কমলদাকে দেখেছিলাম।সেদিন আমার কেন জানি মনে হয়েছিল কমলদা আমাকে দেখে অবাক চাহনিতে চেয়েছিল। আমার দিকে কমলদা এখনও মাঝেমধ্যে অবাক দৃষ্টিতে তাকান কেন?এমনভাবে তাকান যেন মনে হয় তিনি বুঝি আমাকে অনেক আগে থেকেই চিনতেন।নাকি আমি কমলদার কোন আপন জনের প্রতিচ্ছবি?নাকি সবই আমার মনের ভুল।আমি কবি নই,তবু কমলদার মনের গহীন নদীর পানিতে অন্য কারও আবগাহন দেখতে পাই,আমার মনে হচ্ছে,তার মনের ঘরে কার ও নিত্য বসবাস।তাই আমি ভাবছি,কে সেই মায়াবিনী?সে কি আমার কমলদাকে ভুলে গেছে,তা আমাকে জানতেই হবে।আজ কমলদা আমাকে মাত্র রাত ১১টায় ঘুমাতে পাঠিয়ে দিলেন।কিন্তু কেন?অথচ দাদা তো আমাকে প্রতিদিনই রাত ১২টা পর্যন্ত পড়তে বলেন,তাহলে আজ কেন তিনি আমাকে ১১টায় ঘুমাতে পাঠালেন।নাকি গভীর রাতে আমার সাহচর্যে কমলদার কোন অতিথের স্মৃতির ব্যাঘাত ঘটেছে?কমলদা একদিন আমাকে ডায়েরী লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে বলেছিলেন।এজন্যে আমি প্রতিরাতে ঘুমাবার দিনের শেষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর ডায়েরি লিখি।তাই আজ থেকে দাদাকে নিয়ে ডায়েরির পাতায় লেখা শুরু করলাম।”মিতু”
কমল মিতুর লেখা ডায়েরির পাতাটি পড়া শেষ করে আবার পাতাটি মিতুর বিছানায় রেখে নিজ বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে।
কমল পরদিন সকাল ৬টায় ঘুম উঠে।
মিতুর মা ইতিপূর্বে ঘুম থেকে উঠে ঘরের দরজা জানালা খোলে দিয়েছে।কমল মিতুর মাকে বলে তার লজিং বাড়ির উদ্দ্যেশে রওয়ানা দিতে চাচ্ছে।মিতুর মা কমলকে চা তৈরি হয়েছে বলে যেতে বারন করলেন।মিতু ঘুম থেকে উঠে একটা নতুন টুথব্রাশ ও ফেষ্ট নিয়ে আসে।অগত্যা কমল মুখ ধৌত করে চা-নাস্তা খেয়ে তার দাদামনির বাড়ি পৌঁছায়।কমলের লজিং বাড়ির ছাত্র-ছাত্রীরা পড়তে বসেছে।আজকে কমলের “দর্শনের সমস্যাবলী”বিষয়ের টিউটিরিয়েল পরীক্ষা।তাই মিতুদের বাড়ি থেকে আসার সময় কমল তার একটি বই সংঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।তার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার পাশাপাশি তার পড়ালেখার কাজও চলছে।এভাবে জীবনযুদ্ধে সফলতা লাভের জন্যে কমল চেষ্টা করে যাচ্ছে।প্রবাস জীবনের প্রত্যাহিক জীবন সংগ্রামে কমল কি সফল হতে পারবে?তার ভাইবন্ধু সাধনের পত্রে সে জানতে পারে,কমলের প্রানের প্রিয়তমা পল্লবীর মা প্রতিভা দেবী নাকি সাধনকে জানিয়েছেন,অন্তত
পক্ষে কলেজের প্রভাষক ছাড়া সে তার মেয়ে পল্লবীকে বিয়ে দিবে না।এ প্রশ্নের সমাধান সে খুঁজে পায় না।সাধনের পত্রের লেখা পড়ে আজ বুঝতে পেরেছে,পল্লবীর যোগ্য হতে পারবে না।সে যে ডিগ্রি পাস এর ছাত্র।অনার্স ছাড়া তো প্রভাষক হওয়া যাবে না।সাধনের পত্রের সত্যতা যাচাই করা তো কঠিন ব্যাপার!তবুও কমলকে থেমে গেলে চলবে না।তাকে এগিয়ে যেতে হবে।সকল দ্বিধা-দ্বন্দের অবসান ঘটাতে কমল তার প্রিয়তমা পল্লবীর ও তার মায়ের মুখোমুখি হতে হতে হবে।কমল কোন পাতা কুড়ানিদের ঝরা পাতা নয়।পাতা কুড়ানির দলেরা তাকে কুড়িয়ে নিয়ে কোন আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেবে বা আগুন জ্বলতে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করবে।
আর মিতুর মনের সন্দেহগুলির স্থায়ী সমাধানে কমল তার জীবনের পাওয়া না পাওয়ার বেদনাগুলি মিতুকে শেয়ার করতে হবে।যাতে কমলের জীবনে নতুন কোন ঝড় এসে কমলের জীবনকে দ্বিতীয়বার তছনছ না করতে পারে।সেজন্য কমলকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন কমলের ক্ষতি করতে না পারে।কখনও কখনও কমল নিজেকে বড়ই অসহায় মনে করে।যখন তার শরীরে সামান্য অসুখ বা জ্বর হয়,তখন সে একটুকু স্নেহের জন্যে কাতর হয়ে পড়ে।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ