আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

বাবা শিক্ষক, সন্তানের কি ঈদ অানন্দ!-শিক্ষার কণ্ঠস্বর

বাবা শিক্ষক৷ মহান পেশা গ্রহণ করেছেন৷ যে যেখানেই দেখে বাবাকে সালাম দেন৷ সন্তানকেও লোকেরা মাস্টারের মেয়ে বলে স্নেহের চোঁখে দেখে৷ বাবার নামে সন্তান কতই গৌরবের! কিন্তু অন্য ছেলে মেয়েদের মত তারাও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদে স্বপ্ন পুরো বছর জুড়েই দেখতে থাকে৷ স্বপ্ন দেখে নতুুন জামা পরিধানের৷ রমযান অাসলে স্বপ্নটা অারো ঘনিভূত হয়৷ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেদনা দায়ক পীড়া হচ্ছে সন্তানের চাওয়া অসম্পূর্ণ রাখা৷ কিন্তু সন্তানদের এ স্বপ্ন পূরণ করা কিভাবে? চার হাজার টাকা ঈদ বোনাসে কি দু’টি সন্তান ও স্ত্রীকে বর্তমান বাজারে নতুন পোশাক কিনে দেয়া যায়? শিক্ষক সারা বছর যা বেতন পান তা থেকে কি ঈদ কেনা কাটার জন্য টাকা জমা রাখা যায়? সন্তানের চাওয়া মেটানো যে বড়ই তৃপ্তির! বড়ই অানন্দের! সে চাওয়া পূরণ করতে না পারলে সংসারের কর্তা ও সংসারের রাজা -‘বাবা’ যেন অসহায় এক নিস্তেজ প্রাণি৷ শুধু ফেলফেলিয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়৷

অামি শিক্ষক, অামি অামার শিক্ষার্থীদের বড়ই ভালোবাসি৷ তাদের কাছে অামি রাজা, ভালো বক্তা, অামি বন্ধু, অামি পিতা, অামি পথ প্রদর্শক অামি অারো কত কি!
ছাত্ররা বর্তমানে শিক্ষকদেরকে বন্ধুই মনে করে৷ তাতে একটি ভালো ফলও অাছে৷ ছাত্রদের শিক্ষক ভীতি কমে যায় ও শিখন শিখানো কার্যক্রম অতি সহজতর হয়৷ অামরাও ছাত্রদেরকে অাদর, স্নেহ ও বন্ধু ভেবেই পাঠদান করে থাকি৷ এটিই অাধুনিকতার সহিত শিক্ষাদান৷

একদিন ঈদ অালোচনার কথার ছলে হঠাৎ দশম শ্রেণির এক ছাত্র জিজ্ঞাসা করলো, ”স্যার, আপনারা কত পারসেন্ট ঈদ বোনাস পান?” কথাটি শুনেই কাচুমুচু খেতে লাগলাম। তারা জানলো কিভাবে? উত্তর কী দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাদের কাছে অামি মহান ব্যক্তি! ব্যাপারটা লজ্জাকর ব্যাপারই হয়ে দাঁড়াল। একটু নিচু স্বরেই উত্তর দিলাম ২৫% । পুণরায় জিজ্ঞাসা করলো, ”কত টাকা আসবে, স্যার?” বললাম সহকারি শিক্ষকদের ৪০০০ টাকা আর যার টাইম স্কেল পেয়েছেন তারা ৫৫০০ টাকা। সে আর কিছুই বললো না। খুব অাস্তে অাস্তে বলতেছিল, ” কাকে কাকে নতুন জামা দিবেন, স্যার?” নিজেই ভাবতে লাগলাম অার যেন কি প্রশ্ন করে! ভাবছি, ৪০০০ টাকার ঈদ বোনাস! ছাত্ররাও জেনে গেল? বর্তমান সমাজে অর্থের সাথে মানুষের মান সম্মানও নির্ভর করে৷ ভাবনাটা অাবার ফিরে এলো- মেয়ে পাবে কি, অার ছেলেই বা পাবে কি? একজন পরিকল্পিত পরিবারে পিতা মাতাসহ ০৬ জন সদস্য থাকার কথা এবং অামরা ছয় জনই। নিজে কিছু কিনার কথা তো কখনই ভাবি না; পূর্বেও কখনো ভাবতাম না ৷ আরো তো বাকি থাকে ০৫ জন সদস্য। কাকে কি দিবো! অামার হিসাব একটু ভিন্ন কারন অামি একজন শিক্ষক৷ হাতে টাকা না থাকলে নিজকে মিতব্যয়ী উপাধী দিতে পছন্দ করি। এক ছেলে, এক মেয়ে৷ অাছে বৃদ্ধ পিতা মাতা৷ বাজারে এত কম টাকায় ছেলে মেয়েদের দেয়ার মতো কোনো জামাই নেই। খাবার দাবার অায়োজনের কথাটা অাপাতত না হয় না নাই ভাবলাম। স্কুল খোলার ভাব ধরে খরচ এড়াতে না হয় শ্বশুর বাড়ি ও বোনের বাড়ি বেড়ানো কথাটা এড়িয়ে চলে এলাম। কিন্তু মেয়ে তো স্কুলে পড়ে তাকে যে একটি নতুন ভালো জামা না কিনে দিলে সে বান্ধবিদের সাথে প্রেসটিস বাঁচিয়ে ঈদের আনন্দটাই করতে পারবে না।

গত সপ্তাহে এক শিক্ষক বন্ধুর বাসায় ইফতারের দাওয়াতে গেলাম৷ দু’জনে অালাপের মাঝে তার স্ত্রী এগিয়ে এলো৷ জিদ করে অামাকেসহ শুনানোর জন্যই তিনি অামার বন্ধুকে বললেন, ”এ বছর ঈদে আমাকে কী দিবে?” উত্তর সোজাভা্বেই হলো, ”চার হাজার টাকার ঈদ বোনাস, কত টাকার শাড়ে নিবে?” অন্যদের ব্যাপারে কি হবে? তার স্ত্রী বললো, ”আমার কিছুই লাগবে না। মেয়েটিকে এবার একটু ভালো চাইয়া জামা কিনে দিও। মেয়ে হাই স্কুলে পড়ে তার প্রেসটিজ আছে। বান্ধবীদের সাথে উঠা বসা করতে হয়।”

গত সপ্তাহে এক দিন মার্কেটে গেলাম। এ বছর জামা কাপড়ের দর দাম কেমন তা জানার জন্য। বড় মার্কেটে গেলাম না। কারন সেখানে আমি কখনোই যাই না। কোন ছাত্ররা কৌতুহল করে জিজ্ঞাসা করলে বলে দেই, বড় মার্কেটে অার ছোট মার্কেটে একই জামা বিক্রি হয়। বরং বড় মার্কেটে লাইটিং করে জামার দাম বেশি রাখে৷ অনার্থক বেশি দাম দেয়ার প্রয়োজন কি? নিজে যতই নিজেকে পন্ডিত ভাবি ছাত্ররা ঠিকই বুঝে, ওরা অাধুনিক ছেলে পেলে, অাড্ডা জমায়, ”স্যারে কিপ্টা৷” যদিও শিক্ষকের অনুপস্থিতে তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে অারো খুব মজা করে। একটি অস্থায়ী মার্কেট! যেটি শুধু ঈদেই বসে, বাকি সময় হকাদের স্থায়ী মার্কেট হয়ে থাকে। দেখলাম এক ভদ্র লোক অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে শুধু জামা দেখছেন। কিন্তু কিছুই কিনছেন না। কারন তার মেয়ের যে জামা পছন্দ হয় সেটি ভদ্র লোকের দামে পছন্দ হয় না। ভদ্র লোকের পছন্দ হলে মেয়ের পছন্দ হয় না। ইচ্ছা করেই অনধিকার চর্চা করলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ”ভাই, কী করেন?” ”শিক্ষকতা”, গম্ভীর স্বরে উত্তর এলো। আর কিছুই বললাম না। কিছু বলতে গেলে নিজের ঘাঁড়ে এসে পড়ে। মেয়েটির মনটা খুবই খারাপ দেখলাম। মেয়েটি নাকি নবম শ্রেণিতে পড়ে।

গত বছর অাগের ঘটনা৷
এক ভদ্র লোকের সাথে কোনো এক কাজে বন্ধুত্ব! চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল৷ হঠাৎ তিনি একদিন মজা করেই বললেন, ”বাংলাদেশের সেরা কিপ্টা শিক্ষক। একবার একটা জামা কিনলে দশ বছর পার করে দেয়। ঈদেও একটা নতুন জামা বানায় না।” আমি খুব চুপ করে মনটা খারাপ করাতে তিনি চালাকি করে কথাটি একটু ঘুরিয়ে বললেন তবে বর্তমানের শিক্ষকেরা আবার একটু মডার্ন । আমি আর কিছুই বললাম না। কারন আমি বা আমরা তাদের আলোচনারই প্রধান চরিত্র।

রোজার আট তারিখে বাড়ি গেলাম। মা বললেন, ”পুত, এ বছর তুই কোন কাপড় চোপড় আমার জন্য কিনিস না।” ”কেন, মা?” জিজ্ঞাসা করলাম৷ তিনি বললেন, ”তোর কাপড় ভালো পড়ে না। তুই কাপড় চিনে কিনতে পারিস না।” আসলে আামি সবই চিনি শুধু মা,বাবা, স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের জামা কাপড় চিনি না; কারন আমি শিক্ষক । আমি জামা কাপড় ভালোভাবে চিনার কথা না। ভিতরে ভিতরে যতই পিড়া দেউক, ক্লাশ রোমে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে ক্লাশ নিতে গিয়ে সবই ভুলে যাই। কিন্তু ফেইসবুকের যুগে সকল খবরের লিংকই ফেইসবুকে দেয়া হয়। আর ছাত্ররা তা পড়ে পড়ে আমাদের ব্যক্তিগত অবস্থানটাও বুঝতে পারছে।পুজিবাদি এ সমাজে টাকা হলেই মানুষের সম্মানও বাড়ে৷ শিক্ষকদের পিতৃকাল থেকে শুণে আসা সম্মান এখন বিভিন্নভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ। মঞ্চে বসে থাকা বক্তার নামে যত বেশি সম্মানসূচক অ্যাড্রেসিং করা হয় ততোই তার বক্তব্যের মাধুর্য্যতা বৃদ্ধি পায় ও তার বক্তব্যের পরিধিও উত্তেজনামুলক এবং দীর্ঘ হয়ে থাকে৷ অতি জান্তা লোকও অর্থ সংকটে জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে৷ অামরা শিক্ষক বলে কিছু জান্তা হলোও লোক সমাজে বোকা হতে হয়৷

মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
সহকারি শিক্ষক
বড় গোবিন্দপুর এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়
চান্দিনা, কুমিল্লা৷

 

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ