আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :
«» জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার উপায় «» সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মোস্তফা কামালের ‘থ্রি নভেলস’ «» ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের প্রতিবাদে পটুয়াখালীর বাউফলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সামবেশ «» দুমকিতে ডাব খাওয়ার অপরাধে দু’ছাত্রকে মারধর,শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টা «» কলাপাড়ায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রচার ও উন্নয়ন ভাবনা শীর্ষক মতবিনিময় সভা «» স্বরুপকাঠীতে শিক্ষক সমিতির ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত «» নদী বিষয়ক বইমেলা উদ্বোধন «» নরসিংদীতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্ট এর উদ্বোধন «» ঢাকায় সাপের দংশনে প্রাণ গেল কলেজছাত্রের «» লন্ডনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

মাদকের বিষে নীল জীবন

বকুল আহমেদ

চার বছর ধরে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে বাস করছে ১১ বছরের শিশু রুবেল। সাত বছর বয়সে সে যখন স্টেশনে এসেছিল, তখন মানুষের কাছে হাত পেতে খাবারের টাকা জোগাড় করত। কারও দয়া হলে খাবার জুটত, নয়তো না খেয়েই দিন কাটত তার। দুই বছর আগে টিটিপাড়া বস্তির এক নারীর প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে শিশুটি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। কিছু না ভেবে ওই নারীর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে স্টেশন এলাকায় গাঁজা বিক্রি করতে রাজি হয়ে যায় সে। তিন মাস আগে টিটিপাড়ার ওই নারী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। এর পর থেকে রুবেলের গাঁজা বিক্রি বন্ধ। তবে গাঁজা সেবন বন্ধ করেনি। এখন ট্রেনযাত্রীদের ব্যাগ-ব্যাগেজ বহন করে যে ক’টাকা পায়, তার বেশিরভাগই ব্যয় করে মাদক সেবনে। তার বাবা-মা কোথায় থাকে, তা জানে না; জানার চেষ্টাও করে না। স্টেশনের বাসিন্দা- এটিই তার পরিচয়।

রুবেলের কাছে ওই মাদক ব্যবসায়ী নারী নিজের নাম-পরিচয় জানায়নি। ‘খালা’ বলে সম্বোধন করতে বলা হয়েছিল রুবেলকে। তাই সে ওই নারীকে খালা নামেই চেনে। শুধু রুবেল নয়, রাজধানী ঢাকায় এমন হাজার হাজার পথশিশু-কিশোর মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের সংস্পর্শে এসে প্রতিদিনই নতুন করে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। এদের কারও বাবা অন্য নারীকে বিয়ে করে চলে গেছে, কারও মা অপর ব্যক্তিকে বিয়ে করে পেতেছে নতুন সংসার। আবার কারও বাবা-মা থাকলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তাদের সঙ্গে। রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন, সদরঘাট, বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, সড়কের ফুটপাত কিংবা বিভিন্ন পার্কই যেন তাদের জন্য হয়ে উঠেছে আবাসস্থল। তাদের মাদক সেবনের দিকে ঠেলে দিতে বড় ভূমিকায় মাদকের খুচরা ব্যবসায়ীরা। সুপরিকল্পিতভাবে তারা ফাঁদ পাতে, যাতে শিশু-কিশোররা তাদের ক্রেতা হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শিশুদের ‘নিরাপদ’ মনে করে মাদক বহনেও ব্যবহার করে কারবারিরা। এসব শিশু-কিশোরের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত, তা তাদের বোঝানোর মতো যেন নেই কেউ। মাদকাসক্ত এসব শিশু-কিশোর জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে। অপরাধ কী- বোঝার আগেই ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে বেড়ে উঠছে তারা। সমকালের অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে পথশিশু-কিশোরের বর্তমান সংখ্যা কত, তার হিসাব নেই সরকারের কাছে। এমনকি সারাদেশে কতজন মাদকাসক্ত, তারও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়ে থাকে, দেশে ৭০ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। গত জুনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়েছে, মাদকসেবীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুবক, তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। শিশু মাদকসেবীর পরিসংখ্যান বলা হয়নি তাতে। তবে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবমতে, ঢাকায় পাঁচ লাখের মতো পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ মাদকাসক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০০২-০৩ সালে এক গবেষণায় বলেছে, পথশিশুদের ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত। আইসিডিডিআরবি সর্বশেষ ২০১১ সালের এক গবেষণায় ৫১ শতাংশ পথশিশুর মাদকাসক্তের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। এটি কয়েক বছর আগের গবেষণা তাদের।

অপরাজেয় বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক ড. জাহেদুল ইসলাম জাদু জানান, বছরে তারা পথশিশুসহ সুবিধাবঞ্চিত ৮৫ হাজার শিশুকে বিভিন্ন ধরনের সাপোর্ট দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে ৮৫ ভাগ শিশু মাদকাসক্ত। অ্যাকশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারহা কবির বলেন, এসব শিশুকে দিয়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা ও সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়ে পথশিশুরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কে নেবে এসব পথশিশু-কিশোরের দায়িত্ব? মাদক-জীবন থেকে কে ফেরাবে তাদের? নাকি মাদকেই শেষ হয়ে যাবে অভিভাবকহীন পথশিশু-কিশোররা! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। এসব শিশু-কিশোর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেটের ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে। পেটের তাগিদে তারা মাদক সরবরাহ বা বহনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারের। পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে জনশক্তি হিসেবে তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, অল্প বয়সে মাদক সেবন করলে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রচণ্ড মানসিক ক্ষতি হয়। চিন্তার বিকাশ সঠিকভাবে হবে না। যার ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আত্মকেন্দ্র হারাবে; অস্বাভাবিক শিশু হিসেবে বেড়ে উঠবে মাদকাসক্ত শিশুরা।

পথশিশু-কিশোররা কীভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়ছে- সে তথ্য তুলে আনতে সম্প্রতি কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন, সদরঘাট, বাহাদুর শাহ পার্ক, পল্টন এলাকা, মহানগর নাট্যমঞ্চসংলগ্ন পার্ক, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধান চালায় সমকাল। এসব এলাকার অন্তত দুইশ’ পথশিশু, কিশোর ও কিশোরীর সঙ্গে কথা হয় সমকালের। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৭৫ জন মাদকাসক্ত। তাদের প্রায় প্রত্যেকের মাদক সেবনের শুরুটা অভিন্ন। প্রথমে সিগারেট। এর পর অপর মাদকাসক্তের সংস্পর্শে এসে ড্যান্ডি ও সিগারেটের সঙ্গে গাঁজা সেবন শুরু। পর্যায়ক্রমে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকে। ড্যান্ডি সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে একটি উপাদান আছে, যা মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার-টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। পলিথিনে মুখ লাগিয়ে ড্যান্ডি সেবন করে পথশিশুরা। দীর্ঘ মেয়াদে ড্যান্ডি সেবন করলে মস্তিস্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এসব শিশু-কিশোর নেশায় বুঁদ হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ব্লেড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে নিজের শরীর। তাদের সুচিকিৎসা হয় না। এমন এক ১২ বছরের শিশু ইমনের সঙ্গে গত ৬ জুলাই দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে কথা হয়। সে সময় ইমনসহ ১৭ শিশু-কিশোর পাকা কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছিল। ইমনের বাড়ি নরসিংদীর মাধবদী থানার বউবাজার এলাকায়। তার মা মারা গেছে। বাবা তারেক গার্মেন্ট কর্মী। তার ভাষায়, অনেক ছোট থাকতে সে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসেছে। মাঝেমধ্যে বিমানবন্দর রেলস্টেশনেও থাকে। তার দুই হাতের কনুই পর্যন্ত অসংখ্য কাটা চিহ্ন ও বাঁ গালে লম্বা করে একটি কাটা দাগ দেখা যায়। হাত-মুখের এই অবস্থা কীভাবে হয়েছে- জানতে চাইলে ইমন বলে, ‘নেশা হয়ে গেলে কী করি, মনে থাকে না।’ ট্রেনযাত্রীদের লাগেজ বহন করে আয় করে বলে জানায় সে। রাকিব নামের আরেক শিশু জানায়, নেশা করার সময় নিজের শরীর রক্তাক্ত করতে ভালো লাগে তার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদকাসক্ত শিশু-কিশোরদের চিকিৎসায় সরকারিভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রসহ সারাদেশে রয়েছে মাত্র চারটি। অপর তিনটি চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে। কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ১০০ শয্যার মধ্যে শিশু বা পথশিশুদের জন্য রয়েছে ১০টি, যা খুবই অপ্রতুল। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে মাত্র ৭৪ শিশুকে সরকারিভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় সেখানে। এর মধ্যে পথশিশু হাতেগোনা কয়েকজন।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান পরামর্শক সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেন, পথশিশুদের কেউ পথ থেকে তুলে দিয়ে গেলে চিকিৎসা করানো হয়। এ ছাড়া নিজস্ব উদ্যোগে সেভাবে করা হয় না, কারণ তাদের সুস্থতার পর ফেরত দেওয়া হবে কার কাছে? রাস্তায় ফিরে গিয়ে তো আবার একইভাবে নেশা শুরু করবে।

কেন্দ্রীয় নিরাময় কেন্দ্রের আবাসিক মনোরোগ চিকিৎসক কাজী লুতফূল কবীর বলেন, ২০-২২ বছর বয়সের আগ পর্যন্ত মানুষের ব্রেইন পরিপূর্ণ হয় না। মাদক সেবন তো এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অল্প বয়সে মাদক সেবন করলে ক্ষতির মাত্রাটা বহুগুণে বেড়ে যায়। এতে শিশুদের মস্তিস্ক বিকশিত হয় না। ফলে বোধশক্তি কমে যায়, জাজমেন্ট ক্ষমতা হারায়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, পথশিশুরা পরিবারকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে না। শিশুকালেই পৃথিবীর কঠিন কদর্য পরিস্থিতির চিত্র তার সামনে উঠে আসে। বাস্তবতার মুখোমুখি হতে গিয়ে সে মুষড়ে পড়ে। তখন ক্ষণিকের আনন্দ লাভের জন্য কল্পনার জগতে বিচরণ করতে চায়। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। যৌন নিপীড়ন থেকে শারীরিক নির্যাতন- সেগুলো মোকাবেলা করতে গিয়ে যখন পারে না, তখন অন্যজগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কারণে শিশু-কিশোরদের এই অবস্থা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সুযোগ-সুবিধা নেই। সরকারের দায়িত্ব এদের দেখভাল করা। তাদের বিষয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বাবা-মা তো সবার থাকে না। বেঁচে থাকার জন্য এসব শিশু অনেক পথ বেছে নিতে পারে। এ জন্য পথশিশুদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এটা সরকারের দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব, রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব। তারাই তো প্রান্তিক গোষ্ঠীকে দেখভাল করবে। তিনি আরও বলেন, এসব শিশু-কিশোরকে অনেকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, কিন্তু কেউ তাদের যত্ন করে না। সুত্র সমকাল

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ