আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

শিক্ষকতা: সম্মানের নাকি পেটের দায়ে?শিক্ষার কণ্ঠস্বর

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শিক্ষকতা মহান পেশা, সম্মানের, শিক্ষকেরা মানুষ গড়ার কারিগর, জাতির বিবেক, জাতির নির্মাতা, সম্মানিত ব্যক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি মুখ রুচিকর অারো কত কিছুতেই ভূষিত করতে শোনা যায়৷ বাস্তবে এর বাস্তবতা কতটুকু তা তিন সপ্তাহ কনকনে শীতে পলিথিন মুড়ে রাস্তায় শুয়ে থাকার পর সাধারণ জনগন ও সরকার শিক্ষকদের প্রতি কতটা দরদ তা দেখলেই বুঝা যায়! সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বেলায় তা বাস্তব হলেও বেসরকারিদের বেলায় কী, তা প্রশ্নাতীত! শিক্ষকতায় প্রবেশ করে শিক্ষকেরা অাজকাল সমাজ ও শিক্ষার্থী থেকে কতটুকু সম্মান পান তা লুকোচুরি নয়৷ অাগেরকার দিনে শিক্ষকেরা বেতনের নামে যৎসামান্য গুরু দক্ষিণা পেলেও সমাজে এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সম্মান পেতেন পাহাড় পরিমাণ! কিছু বাস্তব উদাহরণ টানলে ব্যাপারটি স্পর্শ হয়ে উঠবে৷

১. শিক্ষক ছিলেন এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিমান ও গণ্যমান্য ব্যক্তি৷ সমাজের সকল বিচার-অাচার, বুদ্ধি, পরামর্শ, অনুষ্ঠান শিক্ষকের নেতৃত্বে সম্পন্ন হতো৷ বর্তমানে সমাজে শিক্ষকদেরকে এ সকল কর্মকান্ডে সমাজে ডাকতে দেখা যায় কিনা? শিক্ষক বিচার করলে সমাজ সে বিচার মানে, নাকি তথাকথিত বড় ভাইয়েরা বিচার করলে মানে?

২. অভিভাবক, এলাকাবাসি ও যুবসমাজ শিক্ষকদেরকে যতটুকু সম্মান করতো এখন সে পরিমাণ সম্মান করে কিনা? একটি এলাকার কোনো জাতিয় দিবস বা ফুটবল/ ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের ফাইনাল খেলায় গুরুত্বপূর্ণ মেহমান হিসেবে কে দাওয়াত পান সে দিকে একটু নজর দিলে সম্মানের ব্যাপারটি অারো স্পর্শ হয়ে উঠবে৷

৩. কোনো অালোচনা সভা কিংবা অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের চেয়ারটি কোন সারিতে দেখা যায়? সেদিকেও নজর দেয়া যেতে পারে৷

৪. এক কালে অামরা শিক্ষকদের দেখলেই পায়ে ধরে সালাম করতাম৷ শুধু তাই নয়, স্কুল ছুটির পরে স্যারকে সালাম করার জন্য লাইন ধরতে হতো৷ এখন কতজন শিক্ষার্থী শিক্ষকদেরকে ধর্মীয় মোতাবেকই বা সালাম দেন৷

৫. ছাত্রদের ছোটো খাটো শাস্তি দিলে পত্র পত্রিকায় বিরাট লেখাসহ শিক্ষককে লাল দালানে যেতে হয়; কিন্তু ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লঞ্ছিত ঘটনার বিচার কোনটি হয়েছে?

৬. ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক হচ্ছে জীবন গড়ার সম্পর্ক৷ শিক্ষকেরা কেন শিক্ষার্থীদের প্রতি দূর্বল হয়ে কথা বলতে হয়?

৭. সমাজের সকলের মত শিক্ষকেরাও সংসার চালাতে হয়৷ শিক্ষকদেরও অাছে পরিবার পরিজন৷ অন্যান্য সকল চাকরির মত শিক্ষকেরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে শিক্ষাদান করেন৷ কিন্তু পাওনার বেলায় তাদের প্রতি অবহেলার চোঁখে দেখে বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় কেন? পরিশ্রমের বিনিময়ে কেন অনুদান পেতে হয়? তা-ও অাবার মাসে দ্বিতীয় সপ্তাহে!

৮. সরকারি কিংবা বেসরকারি যে কোন চাকরিতে একবার প্রবেশ করলে একই ডিপার্টমেন্টে চাকরির কর্মস্থল পরিবর্তন ও পদোন্নতির জন্য অার নতুন করে ইন্টারভিউ দিয়ে নতুন করে চাকরি নিতে হয় না৷ কিন্তু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির স্থল পরিবর্তন ও পদোন্নতির জন্য সারা জীবনই পরীক্ষা দিতে হয় কেন?

৯. পৃথিবীর এমন ক’টি দেশ অাছে যে দেশে শিক্ষকেরা চাকরি করে বেতনের জন্য কনকনে শীতে পলিথিন মুড়িয়ে রাস্তায় শুয়ে অনশন করতে হয়? বাংলাদেশে শিক্ষকদের যদি এতই মর্যাদাবান মনে করা হতো তাহলে বছরের পর বছর অান্দোলন করার পরও তাদের কোনো চাহিদার দিকে মর্যাদার চোঁখে তাকানো হয় না কেন?

শিক্ষকতা এক সময় ছিল মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনাল ভিত্তিক৷ তখন শিক্ষকতা করতেন ধনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের চাহিদাহীন ব্যক্তি৷ এখন শিক্ষকতা হচ্ছে চাকরি৷ পেটের দায়েই সবাই চাকরি নিয়ে থাকেন৷

শিক্ষকতা চাকরি সকলেই অতি অানন্দ ও উদ্দীপণার সহিত গ্রহণ করে থাকেন এবং প্রথম দুই- তিন বছর চাকরিটা এতো মজা লাগে যেন কোনো বেতন না পেলেও করতে ইচ্ছে হয়৷ কিন্তু যখনই সংসারের গ্লানি মাথার ওপরে পড়ে তখনই ধীরে ধীরে উপভোগ হয়- জীবনটা কী? মানুষের সম্মান কোথায়? পুজিবাদি এ সমাজে শিক্ষকদের অাসন কোথায়? কেন বাবা-মা পড়া লেখা শিখিয়েছিলেন এবং শিক্ষকেরা বৃদ্ধ পিতা মাতার জন্য কী করতে পারছেন? সমাজের অন্যান্য চাকরিজীবীর মত কেন একজন শিক্ষকের স্ত্রি ও সন্তান ঈদে সবার সাথে তাল মিলিয়ে একই কাপড়ের নতুন জামা না পড়ে ফুটপাত থেকে জামা পড়তে হয়? শিক্ষকেরা কেন কথায় কথায় এমপিও হারানোর হুমকি শোনতে হয়?

এসকল কথা মনে হলে শিক্ষক সুস্থ ও সুন্দর মস্তিস্ক নিয়ে জীবন যাপন করতে পারেন না৷ কিন্তু সময় হারিয়ে এমন একটা ফাঁদে তখন অাটকিয়ে থাকেন যখন বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারনে তাদের সর্ব দিকের চাকরি, ব্যবসা এমনকি বিদেশে যাবার পথও অার খোলা থাকে না৷ সবকিছু সহ্য করে এবং অারো কিছু সহ্য করেও শিক্ষকতাই করতে হয়৷ লোক সমাজে সম্মানহানি, তিরস্কারের ভঁয় এবং সংসারের গানি যেভাবেই চলুক শিক্ষকতা ছাড়া যেন অার পথ থাকে না৷ যতই সম্মান অার মর্যাদার অাশা অার কথা থাকুক না কেন সব হারিয়েও শিক্ষক শিকলে বাধা৷ শিক্ষক জীবনে যদি অন্যকোন চাকরির বা উপার্জনের সহজ পথ থাকতো তাহলে বাংলার অাপামর জনতা দেখতে পেত কতজন বেসরকারি শিক্ষক শিক্ষকতায়  তাদের চাকরি জীবন সমাপ্ত করেন!

সব শেষে বলবো- অামাদেরকে কেউ বাধে নাই৷ অামরা নিজেদের পায়ে নিজেরাই শিকল পড়েছি৷ এ যেন- ”জেনে শুনেই বিষ পান করার মত৷” মর্যাদা অার বিত্ত থাকুক বা নাই থাকুক শিক্ষকতা করতে হবে- এ কথা রাষ্ট্র সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপলব্ধি করতে পারছে৷  সকল হতাশা ও বঞ্চনার মাঝেও পেটের দায়ে এখন শিক্ষকতা করতেই হবে৷ ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদার অাশা অার করতেও চাই না৷ ২২ দিন রাস্তায় শুয়ে থেকেও কোনো দাবির এক ইঞ্চিও পূর্ণ হয়নি৷ অামাদের অার মর্যাদা কোথায়? কেন নিজ টাকা দিয়ে বোশেখ পালন করে ভাতা থেকে বঞ্চিত হতে হয়? কে অামাদের কথা শোনে? অামাদের রাস্তা যেহেতু বন্ধ, পেটের দায়েই শিক্ষকতা করতে হবে!

মো. মহসিন মিয়া

শিক্ষক ও কলামিস্ট৷

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ