আজ   ,
সংবাদ শিরোনাম :

শিশুদের হাসি কেড়ে নিচ্ছে কেজি স্কুল


অামাদের যুগে অামরা যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়তাম তখন স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে রাতের বেলা শুধু ছড়া-কবিতাগুলো তালেতালে অানন্দের সহিত পড়তাম৷ কখনো কখনো বড় ক্লাশের ছাত্রদের দিয়ে ক্লাশেই অামাদেরকে শতকিয়া পড়ানো হতো৷ শিক্ষক ক্লাশের বোর্ড  লিখতেন অামরা দেখে দেখে লিখে লেখা শিখতাম৷ শ্রেণি কক্ষে শিক্ষক নির্দিষ্ট পড়া বারবার পড়িয়ে দিতেন, সেখানেই অামাদের পড়া শেষ হয়ে যেত৷ কোনোদিন বাড়ির কাজ দিয়েছে কিনা মনে পড়ে না৷ এখন কেজি স্কুলে শিক্ষা জীবনের শুরু হওয়া নার্সারীতেই পাঁচ বিষয় পড়ানো হয়৷ শিশুরা এক গাদা বই নিয়ে স্কুলে যায়, ক্লাশে দু’চারটি লাইন পড়ার অাওয়াজও শোনা যায় না, ডায়রী ভরে বাড়ির কাজ লিখে অানে, বাড়িতে টিউটরের সাহায্যে বাড়ির কাজ সম্পন্ন করানো হয়, স্কুলের শিক্ষকের কাজ শুধু বাড়ির কাজ দেখা অাবার ডায়রী ভরে বাড়ির কাজ লিখে দেয়া৷প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদেরকে ভালোভাবে দেখবে না- এই ভঁয় ও ভাবনায় অভিভাবক শিশুকে কেজি স্কুলে ভর্তি করান যাতে ভালোভাবে পড়ানো হয়৷ কিন্তু সেখানে কি কিছু পড়ানো হয়? বেতন দিয়ে স্কুলে পড়িয়ে অাবার বাড়িতে টিউটর লাগে কেন? কেজি স্কুলে ভর্তি করানোর পূর্বে দেখা যায় তাদের লিফলেটে লেখা থাকে স্কুলের পড়া স্কুলে শেষ করানো হয়; অথচ ভর্তির পরে দেখা যায় স্কুলে পড়া সম্পন্ন করতে দুইজন টিউটর লাগে৷ শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য কোনো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কেজি স্কুলে অাছে কি? চার-পাঁচ বছরের শিশু স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির কাজ সম্পন্ন করতে বাড়িতে টিউটরের কাছে পড়াশোনা করে খেলাধুলার একটু সময় পায় কি? ”বাচ্চা কেজি স্কুলে পড়ে”- এ গৌরবে ক’টি মা বাচ্চাকে ঘর থেকে বের হতে দেন? একটু সময় পেলে কার্টুন দেখা ব্যতীত বাচ্চার ভাগ্যে অার কী জুটে? শিশুদেরকে পড়ার জন্য চাপ না দিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১৩/০৩/২০১৯ তারিখে নির্দেশণা দিয়েছেন এবং শিশুর ওজনের দশ ভাগের এক ভাগের বেশি ওজনের স্কুল বেগ তাদের কাঁধে না দেয়ার জন্য মহামন্য হাইকোর্টের নির্দেশ থাকলেও তা কয়টি কিন্ডার গার্টেনই অনুসরন করছে? তাছাড়াও কিন্ডার গার্টেনগুলোর নিয়ন্ত্রণে ২০১৭ সালে দেশ ব্যাপী ৫৫৯টি টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও সেগুলো কোনো কার্যক্রম অদ্যাবদি চোঁখে পড়েনি৷ শিশুর পড়ার কি যে চাপ, শিশুরা কেজি স্কুলগুলোতে কি যে পড়ার যন্ত্রণায় থাকতে হয়, এগুলো শুধু অবলোকন করা ছাড়া যেন কোনো উপায় নেই৷ অারো সহজে বোধগম্য করার জন্য মা ছেলে যুদ্ধের দু’টি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরছি-রাত ৮:১৫ টা বাজে৷ ইশার নামাজ শেষে বাসায় ফিরছিলাম৷ মা তার বাচ্চাটিকে পড়ার জন্য ঘরে ইচ্ছেমত পিটিয়েছেন; বাচ্চাটি সইতে না পেরে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তা দৌড় দিলে মা বাচ্চাটির পেছন পেছন ছুটছেন তাকে অারো মারার জন্য৷ অামাকে দেখে মা চলে গেলে বাচ্চাটি রাস্তায় ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতেছিল৷ এক পর্যায়ে সে বমি করে দিল৷ অামি বাচ্চাটিকে হাতে ধরে ঘরে পাঠাতে চাইলে সে তার মায়ের ভঁয়ে যাচ্ছিল না৷ বারবার তাকে বললাম যে তোমার মা অার মারবে না৷ কিন্তু তার বিশ্বাস হচ্ছিল না, তাই অারো একটু দূরে গিয়ে কাঁদছিল৷ বাচ্চাকে মারার কারনটি তার মাকে জিজ্ঞাসা করলাম৷ তিনি উত্তর দিলেন, ”দুই ঘন্টা যাবত লেখাচ্ছি৷ পাঁচ বিষয়ের মধ্য মাত্র দুই বিষয়ে লিখেছে৷ অার লিখতে চায় না৷” তাই তিনি মেরেছেন৷ ভাবলাম এত ছোট বাচ্চার পাঁচ বিষয় লেখা, এর সাথে নিশ্চই পড়াও অাছে৷ একটু পরে তার বাবা হাজির হলে তিনি বাচ্চার মায়ের পক্ষই নিলেন৷ একটু এগুতেই অারেকটি ঘর থেকে মারের অাওয়াজ ভেসে অাসলো৷ মা তার সন্তানটি মারছেন গলায় টিপে অার বলছেন, ”অার মায়া লাগে না, অার মায়া লাগে না৷” এ ঘরের কান্নার অাওয়াজ অামি প্রতিদিনই পেয়ে থাকি৷ বাচ্চাটির প্রতিদিন অাট বিষয় পড়া ও অাট বিষয়ের লেখা সম্পন্ন করতে হয়; সাথে যুক্ত হয় প্রাইভেট শিক্ষকের বাড়ির কাজ৷ বাচ্চাটি পড়ে কেজি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে৷ প্রতিদিন মার খেতে খেতে বাচ্চাটির ভঁয় কমে গেছে৷ এখন তার মায়ের চাপেই সে পড়ায় বসে থাকে৷ ব্যবসায়ী মনমানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠা এসকল স্কুলের শিশুরা কি মানসিকভাবে বেড়ে উঠছে? স্কুল থেকে বই, খাতা ইত্যাদি বিক্রি করার উদ্দেশ্যে তারা অধিক বিষয় পড়িয়ে থাকেন৷ সাপ্তাহিক, মাসিক, টিউটরিয়াল, পার্বিক পরীক্ষার নামে অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপে বাচ্চারা মানসিক ভারসাম্য হারানোর কবলে পড়ছে৷ তাছাড়াও নিম্ন মানের চড়া দামের বই পাঠ্য করে বাচ্চাদের বেগের বোঝা ভারি করিয়ে থাকে৷ এসকল কেজি স্কুলগুলো সাধারণত শুরু হয় সকাল ৮টায়৷ বাচ্চারা চোঁখে ঘুম নিয়ে সকালের মক্তব বাদ দিয়ে স্কুলে হাজির হতে হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই৷ এতে করে বাচ্চারা মক্তব ভিত্তিক ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সকালে তাড়াহুড়া করে স্কুলে যাওয়ায় সকালে নাস্তা প্রায়ই খেতে পারছে৷ খাওয়া নিয়েও মা-সন্তানের মধ্যে সকালের যুদ্ধ শুরু হয়ে থাকে৷ সাধারণত বাচ্চারা এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে চায় না৷ তাই তাদেরকে জোড় করে সকালে জাগাতে হয়৷ অনেক বাচ্চাদেরকে মায়েরা এত সকালে জোর করে স্কুলে দিয়ে অাসতে দেখা যায়৷ অন্যদিকে এসকল স্কুল স্থাপনের কোনো নিয়ম নীতিমালা না থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাকের ডগায় কেজি স্কুল স্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে৷ কোনো কোনো এলাকায় যেন পাল্লা দিয়ে স্কুল স্থাপন করা হচ্ছে৷ মনে হচ্ছে সেটি স্কুল পাড়া৷ অাবার কিছু স্কুলে নিম্ন মাধ্যমিক/মাধ্যমিক পর্যন্ত উন্নীত করতে দেখা যায়৷ কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হলেও কেজি স্কুল কলেজ নামে নামকরণ করতেও দেখা যায়৷ প্রশ্ন এসকল শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী এবং তাদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ কী অাছে? কোনো রকমে এইচএসসি কিংবা স্নাতক পাস করে কয়েকটি বেঞ্চ, চেয়ার- টেবিল বানিয়ে স্কুল স্থাপন করে নিজের নামের পদবী দিচ্ছেন অধ্যক্ষ৷ লাগাম টেনে না ধরায় তারা মনগড়া মত বাচ্চাদের মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে শিক্ষা বিস্তারে করছেন৷ কোনো কোনো বাচ্চারা চাপে অতিষ্ঠ হয়ে নিয়ম মাফিক পড়তেই বসতে চায় না৷ সংস্কৃতি চর্চা ও খেলার সাথীদের সাথে মেশার অভাবে হয়ে যাচ্ছে একাকার৷ প্রতিষ্ঠানে জোর করে দিচ্ছে শিক্ষা কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের মুখের হাসি বাড়াচ্ছে মাননিক চাপ৷পরিশেষে কেজি স্কুল স্থাপণ ও পরিচালনায় নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নসহ এগুলো তদারকি করার ব্যবস্থা প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি অাহবান জানাচ্ছি৷
মোহাম্মদ মহসিন মিয়া

সহকারি শিক্ষক, ইংরেজি

বড় গোবিন্দপুর এএমবি উচ্চ বিদ্যালয়

চান্দিনা, কুমিল্লা৷

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।


ঘোষনাঃ