অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) নিয়ে অতীতের কষ্টকর স্মৃতিগুলো ভোলার  নয়। এক সময় তারা নামকাওয়াস্তে একটি ইনক্রিমেন্ট পেতেন। সেটি অদ্ভুত এক অনড় অচল ইনক্রিমেন্ট ছিল। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর সেটি বেতনের সাথে লেগে থাকতো। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট চালু হলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই পঙ্গু ইনক্রিমেন্টটির বিলুপ্তি ঘটে। তদুপরি প্রায় দু’বছর পর্যন্ত তারা ইনক্রিমেন্ট নামক সোনার হরিণের দেখা পাননি।

এরপর তারা জাতির জনকের তনয়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে বৈশাখী ভাতার মতো ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের আওতায় আসেন। এই আরেকটি কারণে দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়ার প্রতি সবিশেষ কৃতজ্ঞ এবং তাঁরই হাত ধরে শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর অনতিবিলম্বে সরকারিকরণ হবার বিষয়ে একান্ত আশাবাদি। মুজিববর্ষেই সরকারিকরণের ঐতিহাসিক ঘোষণাটি আসছে বলে তারা আশায় বুক বেঁধে আছেন। ঠিক এমন একটি মুহূর্তে বৈশ্বিক মহামারি করোনা দূর্যোগের সময় জনৈক অবসরপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া কর্তৃক শোকাবহ আগস্ট মাসে ঢাকায় শিক্ষকদের মহাসমাবেশের ডাক দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কেবল স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেননি, তাদের সরকারিকরণের স্বপ্নটিকে ধুলিস্যাৎ করে দেবারও পাঁয়তারা করছেন। এ জাতীয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নেতাদের কারণে বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীগণ তাদের প্রত্যাশার তরীটি প্রাপ্তির কূলে ভেড়াতে সমর্থ্য হননি। শিক্ষা সরকারিকরণ বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর জাতীয়করণের পথে এ জাতীয় শিক্ষক নেতাদের হঠকারিতা সাধারণ শিক্ষকদের বরাবরই আশাহত করে থাকে। জাতীয়করণের স্বার্থে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের এ জাতীয় অবসরাধীন নেতাদের এখন বয়কট করাই সমীচীন।

আসল কথা ছেড়ে অন্য কথায় চলে এসেছি। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ইনক্রিমেন্ট নিয়ে কথা বলছিলাম। ইদানিং একটি বিষয়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোনো শিক্ষক কিংবা কর্মচারী নতুন করে উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হলে তার পেছনের অর্জিত ইনক্রিমেন্টগুলো আর বেতনের সাথে যোগ হচ্ছে না। সেটি কেমন কথা ? আমার বোধগম্য হয় না যে, তিনি তার পেছনের ইনক্রিমেন্টগুলো প্রাপ্য হবেন না কেন ? ইনক্রিমেন্ট একজন শিক্ষক-কর্মচারীর ব্যক্তিগত অর্জন। বছর বছর সন্তোষজনক কর্ম সম্পাদনান্তে তিনি সেগুলো অর্জন করেন বা প্রাপ্য হয়ে থাকেন। নতুন স্কেলে উন্নীত হলে অর্জিত ইনক্রিমেন্টগুলো যোগ করে মূল বেতন নির্ধারণ করা উচিত। এটিই স্বাভাবিক বিধান বলে জানি। কিন্তু, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এসব বিধি বিধানের ব্যত্যয় কেনো হয় ? তাদের বেলায় ‘যখন যেমন, তখন তেমন’ নিয়ম চালু করে ইচ্ছে মতো বঞ্চিত করার মানসিকতা কোনদিন পরিবর্তন হবে-সেটি আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না।

আরেকটি বিষয়ে আলোকপাত করতে প্রায়শই ভুলে যাই। বিষয়টি অন্তত আমার কাছে অমানবিক ঠেকে। একজন শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও প্রসেসিং করতে দুই-তিন মাস এমনকি অনিবার্য কারণে কারো কারো ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু এমপিও যখন আসে তখন তিনি পেছনের মাসগুলোর বেতন প্রাপ্য হননা। কেবল চলতি মাসের বেতনটি পান। এটি কেমন কথা ? উক্ত শিক্ষক-কর্মচারী যোগদানের তারিখ থেকে যথারীতি দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তার পেছনের মাসগুলোর বেতন কে দেবে ?  নাকি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনে দুই-তিন মাস কিংবা ছয় মাস সময়ের কোনই মুল্য নেই ? এ বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। এর অবসান হওয়া দরকার। যোগদানের তারিখ থেকে পাই-পয়সা হিসেব করে সবটুকুই দেয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে উচ্চতর গ্রেড দেবার সময় এমপিওভুক্তি নয়, যোগদান থেকে অভিজ্ঞতা কাউন্ট করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করছি। আরেকটি বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করে আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করতে চাই। আগে ইনডেক্সধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন কর্মস্থলে এমপিও হবার আগের সময়ের বকেয়া বেতন নতুন এমপিওতে একই সাথে দিয়ে দেয়া হতো। এখন এর জন্য পরবর্তি এমপিওতে আলাদা করে অনলাইনে আবেদন পাঠাতে হয়। এটি আরেক বাড়তি ঝামেলা। এমপিও সংক্রান্ত কাজে ঘাটে ঘাটে ধর্ণা দেয়া সত্যি কষ্টকর। শোকাবহ আগস্ট মাসে জাতির জনকসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদদের আত্মার চির শান্তি কামনা করে বেসরকারি শিক্ষকদের সব কষ্টের আশু অবসান এবং মুজিববর্ষেই মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর সরকারিকরণের ঐতিহাসিক ঘোষণাটি শুনতে চাই।

লেখক : অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী, অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট

SHARE